কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার ছোবহানিয়া মাদ্রাসায় আইসিটি শিক্ষক নাঈম মাহমুদকে মারধর করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী আলহাজ্ব হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও অস্বস্তি বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দলীয় প্রভাব বিস্তার, শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য এবং গভর্নিং বডির কার্যক্রমে কয়েকজন সদস্যকে অবহিত না করার মতো ঘটনা ঘটে আসছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিটি শিক্ষক নাঈম মাহমুদকে তুচ্ছ কারণে শোকজ নোটিশ দেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ। নাঈম মাহমুদ নোটিশের জবাব দিলেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে গভর্নিং বডির মাধ্যমে তাঁকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে কী কারণে তাঁকে শোকজ করা হয়েছিল এবং বরখাস্তের সিদ্ধান্তের পেছনে পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা কী, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শিক্ষকদের উদ্যোগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিষয়টি মীমাংসার জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বৈঠকে আলোচনার একপর্যায়ে বিএসসি শিক্ষক মো. আলামিন প্রথমে নাঈম মাহমুদের ওপর হামলা করেন। পরে শিক্ষক এ কে এম নুরুল্লাহ এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহও তাঁর ওপর হামলায় অংশ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এ ঘটনার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নাঈম মাহমুদ পদত্যাগপত্র লিখে মাদ্রাসা ত্যাগ করেন। তাঁকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার পরদিন শিক্ষকদের নিয়ে আরেকটি বৈঠক ডেকে বিষয়টি বাইরে প্রচার না করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নাঈম মাহমুদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ এবং তাঁর পদ শূন্য ঘোষণার বিষয়ে গভর্নিং বডির সভা আহ্বান করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সভাটি বিকেল ৩টায় মাদ্রাসার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, গভর্নিং বডির বিএনপিপন্থী কয়েকজন সদস্যকে সভার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। পরে নাঈম মাহমুদের অভিভাবকদের মাধ্যমে সভার খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে উপস্থিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এ খবর জানার পর সভাস্থল পরিবর্তন করে কিশোরগঞ্জে গভর্নিং বডির সভাপতির বাসায় রাত ৯টায় সভা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। নির্ধারিত সময়ে মাদ্রাসায় গিয়ে সভাস্থল পরিবর্তনের বিষয়টি জানতে পারেন ওই সদস্যরা।
পরে তাঁরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে গভর্নিং বডির সব সদস্যের উপস্থিতিতে আলোচনা করে বিষয়টির সুরাহা করার অনুরোধ জানান।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব বেড়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাইফ সিরাজকে অপসারণের পর দলীয় বিবেচনায় গভর্নিং বডি গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় বিএনপিপন্থী সদস্যদের পরবর্তী সভাগুলো সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ ও গভর্নিং বডির সভাপতি মাওলানা অধ্যাপক আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, শিক্ষক নাঈম মাহমুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান এবং গভর্নিং বডির সব সদস্যকে নিয়ে স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।



